নসুমামা ও আমি
ছেলেমানুষ তখন আমি। আট বছর বয়স।
দিদিমা বলতেন, তোর বিয়ে দেব ওই অতুলের সঙ্গে।
মামারবাড়িতে মানুষ, বাবা ছিলেন ঘরজামাই—এসব কথা অবিশ্যি আরও বড়ো হয়ে বুঝেছিলাম।
অতুল আমার দিদিমার সইয়ের ছেলে, কোথায় পড়ে, বেশ লম্বামত আধফর্সা গোছের ছেলেটা। আমাদের রান্নাঘরে বসে দিদিমার সঙ্গে আড্ডা দিত। অতুলকে আমার পছন্দ হত না, কেমনধারা যেন কথাবার্তা। আমায় বলত—এই পাঁচী, যা—এখানে কী? ওইদিকে গিয়ে খেলা করগে যা—
কখনো বলত—অমন দুষ্টুমি করবি তো বাঁশবনে লম্বা শেয়ালটা আছে তার। মুখে ফেলে দিয়ে আসব বলে দিচ্চি
অতুলকে সবাই বলত ভালো ছেলে। লেখাপড়ায় বছর বছর ভালো হয়ে ক্লাসে উঠত, আমার ছোটোমামার সঙ্গে কীসব ইংরিজি-মিংরিজি বলত—যদি তার কিছু বুঝি!
এইসবের জন্যেই হয়তো অতুলকে আমার মোটেই ভালো লাগত না। তা সে যতই ভালো হোক, লোকে তাকে যতই ভালো বলুক।
ভালো আমার লাগত মুখুজ্যেবাড়ির নসুকে। কী সুন্দর ফর্সা চেহারা, ননী-ননী গড়ন, ডাগর চোখদু-টি, বেশ হাসিহাসি মুখখানি। বয়সও অতুল মামার মতো অত বেশি নয়, আমার চেয়ে সামান্য কিছু বড়ো হবে। অতুল মামার বয়েস হয়ত ছিল ষোলো-সতেরো।
নসু হাসলে তার মুখ দিয়ে যেন মুক্তো ঝরত—দিদিমার সেই গল্পের মতো। এমন সুন্দর মুখ আমার আট বছরের জীবনে এ অজ পাড়াগাঁয়ে ক-টাই বা দেখেছি! দিদিমার কাছে এসে বসে মাঝে মাঝে সেও গল্প করত, সে যা বলত তা যেন মধুর, অতি মধুর! আমি হাঁ করে ওর মুখের দিকে চেয়ে একমনে ওর কথাগুলো যেন গিলতাম। অতুলও তো কথা বলে, কিন্তু তার কথা এত ভালো লাগত না তো?
দিদিমা বলতেন—অতুলের সঙ্গে পাঁচীর বিয়ে দেব, বেশ মানাবে।
আমি মুখ ভারি করে বলতাম—ছাই মানাবে। দি
দিমা হেসে বলতেন—ওমা মেয়ের কাণ্ড দেখো। কেন মানাবে না?
—তুমি তো সব জানো!
—তবে তোর মনটা কী শুনি? কাকে বিয়ে করবি তুই?
—ওই নসুকে।
দিদিমা হেসে গড়িয়ে পড়ে বলতেন—এর মধ্যেই মেয়ে নিজের বর বেছে নিয়েচে। ধন্যি যা হোক, একালের মেয়ে কিনা! শুনলে সই, নসু নাকি ওর বর হবে।
অতুলের মা হেসে বলতেন—কেনরে, অতুলকে তোর পছন্দ হয় না কেন?
—অতুল মামার বয়েস বেশি।
—বেশি আর কত? ষোলো বছর।
—তা যাই হোক, ষোলো বছরের বুড়োকে আমি বুঝি বিয়ে করব? নসু ছেলেমানুষ।
দিদিমা বলতেন—দ্যাখো সই একালের মেয়ের কাণ্ড। নসুর বয়স বারো, ওকেই বেশি পছন্দ। তোমার-আমার কাল চলে গিয়েছে। তেরো বছর বয়সে আমার বিয়ে হল, উনি তখন বিয়াল্লিশ, দোজপক্ষে আমায় ঘরে আনলেন। তোমারও তো
অতুলের মা বললেন—আমার অত না! উনি তখন ঊনত্রিশ, আমার এগারো।
—দোজপক্ষ তো বটে।
—শুধু তাই? সতীন বেঁচে।
—আমায় ভগবান সেদিক থেকে নিষ্কণ্টক করেছিলেন তাই খানিক রক্ষে।
মাঝে মাঝে নসুকে অনেকদিন দেখতাম না। আমাদের পাড়ায় সে আসত না খেলতে। আমার প্রাণ হাঁপিয়ে উঠত, ছুটে যেতাম মুখুজ্যেবাড়িতে।
নসুমামা উঠোনে বসে কঞ্চি কেটে খেলাঘরের বেড়া বাঁধছে। সঙ্গে আরও তিন চারটি ছেলে, ওরই বয়সি।
—আমি বলতাম—ও নসুমামা, আমাদের বাড়ি যাওনি যে?
—কী রোজ রোজ যাব! তুই এতদূর এলি যে? আসতে ভয় করে না?
—না।
—খেলা করবি?
—হুঁ।
অন্য ছেলেগুলো তখুনি বলে উঠত—মেয়েমানুষ আবার আমাদের সঙ্গে খেলবি কেন? যা তুই, পুঁটি মান্তিদের সঙ্গে খেলগে যা।
নসু বলত—খেলুক আমাদের সঙ্গে—তাতে কী।
হাবু বলত—ও কী দা দিয়ে কঞ্চি কেটে আনতে পারবে? কী খেলা হবে ওকে নিয়ে? যা তুই
আমাকে কাঁদো-কাঁদো দেখে নসু এসে হাত ধরত। বলত—কেন ওকে অমন কচ্ছিস তোরা? ও কেন কঞ্চি কাটতে যাবে? মেয়েমানুষ, চুপ করে বসে থাকবে। বোস তুই পাঁচী—
আমি অমনি কৃতার্থ হয়ে উঠোনের একপাশে বসে পড়তাম। নসুমামা খেলতে খেলতে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
পড়ার জন্য প্রতিদিন নতুন কিছু
বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তর আর্কাইভ
পুরনোর সঙ্গে থাকছে নতুন লেখাও
যোগাযোগ করতে
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন একজন জনপ্রিয় ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক। তিনি মূলত উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। পথের পাঁচালী ও অপরাজিত তাঁর সবচেয়ে বেশি পরিচিত উপন্যাস। অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে আরণ্যক, চাঁদের পাহাড়,আদর্শ হিন্দু হোটেল, ইছামতী ও অশনি সংকেত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উপন্যাসের পাশাপাশি বিভূতিভূষণ প্রায় ২০টি গল্পগ্রন্থ, কয়েকটি কিশোরপাঠ্য উপন্যাস ও
আরও দেখুন...-
বাংলাদেশ ছিল নদীমাতৃক। নদী ছিল বাংলার জীবনযাত্রার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু আজ যে-টুকু বাংলা আমাদের, সে বাংলা তেমন নদীবহুল নয়। যে-অংশ নদীবহুল এবং নদীর খেয়ালখুশীর সঙ্গে যে অংশের মানুষের জীবনযাত্রা একসূত্রে বাঁধা সে অংশ আজ আমাদের কাছে বিদেশ। অদৃষ্টের এ পরিহাস রবীন্দ্রনাথের কাছে ভয়ানক দুঃখের কারণ হত।
প্রকৃতি রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্ট করেছিল। সেদিক থেকে তিনি ওয়ার্ডসওয়ার্থের সগোত্র ছিলেন। কিন্তু প্রকৃতির বিভিন্ন প্রকাশের মধ্যে নদী কবিকে বোধহয় সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ ক’রেছিল। তাই কবি নদীর কাছে সময়ে অসময়ে ছুটে গেছেন। তাই তিনি নদীর বুকে নৌকাতে ভাসতে এত ভালবাসতেন। নদীর তরুণীসুলভ চাপল্য এবং গতি কবির চিরতরুণমনে গভীর দাগ কেটেছিল। তাছাড়া সংসারের কোলাহল থেকে মুক্তি
-
তপুকে আবার ফিরে পাব, এ কথা ভুলেও ভাবিনি কোনোদিন। তবু সে আবার ফিরে এসেছে আমাদের মাঝে। ভাবতে অবাক লাগে, চারবছর আগে যাকে হাইকোর্টের মোড়ে শেষবারের মতো দেখেছিলাম, যাকে জীবনে আর দেখব বলে স্বপ্নেও কল্পনা করিনি- সেই তপু ফিরে এসেছে। ও ফিরে আসার পর থেকে আমরা সবাই যেন কেমন একটু উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। রাতে ভালো ঘুম হয় না। যদিও একটু-আধটু তন্দ্রা আসে, তবু অন্ধকারে হঠাৎ ওর দিকে চোখ পড়লে গা হাত পা শিউরে ওঠে। ভয়ে জড়সড় হয়ে যাই। লেপের নিচে দেহটা ঠক্ ঠক্ করে কাঁপে।
দিনের বেলা অনেকেই আমরা ছোটখাটো জটলা পাকাই।
দিনের বেলা ওকে ঘিরে দেখতে আসে ওকে। অবাক হয়ে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).
Stay Connected
Get Newsletter
Subscribe to our newsletter to get latest news, popular news and exclusive updates.
Featured News
Advertisement
-
welcome
- by Shamim Ahmed Chowdhury
- ১৫ Jan ২০২৬
-
Thank you
- by bappi
- ১৫ Jan ২০২৬
-
good
- by Shamim Ahmed Chowdhury
- ১৫ Jan ২০২৬
Comments